Sunday, 2 October 2016

লালু- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

লালু
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

তার ডাকনাম ছিল লালু। ভালো নাম অবশ্য একটা ছিলই, কিন্তু মনে নেই। জানো বোধ হয়, হিন্দিতে লালশব্দটার অর্থ হচ্ছে প্রিয়। এ-নাম কে তারে দিয়েছিল জানিনে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে নামের এমন সঙ্গতি কদাচিৎ মেলে। সে ছিল সকলের প্রিয়।

ইস্কুল ছেড়ে আমরা গিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম, লালু বললে, সে ব্যবসা করবে। মায়ের কাছে দশ টাকা চেয়ে নিয়ে সে ঠিকেদারি শুরু করে দিলে। আমরা বললাম, লালু তোমার পুঁজি তো দশ টাকা। সে হেসে বললে, আর কত চাই, এই তো ঢের। সবাই তাকে ভালোবাসত, তার কাজ জুটে গেল। তার পরে কলেজের পথে প্রায়ই দেখতে পেতাম, ালু ছাতি মাথায় জনকয়েক কুলি-মজুর নিয়ে রাস্তার ছোটখাটো মেরামতের কাজে লেগেছে। আমাদের দেখে হেসে তামাশা করে বলত- যা যা দৌড়ো পারসেন্টেজের খাতায় এখুনি ঢ্যারা পড়ে যাবে।

আরও ছোটকালে যখন আমরা বাংলা ইস্কুলে পড়তাম, তখন সে ছিল সকলের মিস্ত্রিতার বইয়ের থলির মধ্যে সর্বদাই মজুত থাকত একটা হামানদিস্তার ডাঁটি, একটা নরুণ, একটা ভাঙা ছুরি, ফুটো করবার একটা পুরোনো তুরপুনের ফলা, একটা ঘোড়ার নাল।
()
কী জানি কোথা থেকে সে এসব সংগ্রহ করেছিল, কিন্তু এ দিয়ে করতে পারত না সে এমন কাজ নেই। ইস্কুল-সুদ্ধ সকলের ভাঙা ছাতি সারানো, শ্লেটের ফ্রেম আঁটা, খেলতে গিয়ে ছিঁড়ে গেলে তখনি জামা-কাপড় সেলাই করে দেওয়া এমন কত কি। কোনো কাজে কখনো না বলত না।
আর করতও চমৎকার। একবার ছটপরবের দিনে কয়েক পয়সার রঙিন কাগজ আর শোলা কিনে কি একটা নতুন তৈরি করে সে গঙ্গার ঘাটে বসে প্রায় আড়াই টাকার খেলনা বিক্রি করে ফেললে। তার থেকে আমাদের পেটভরে চিনেবাদাম ভাজা খাইয়ে দিলে।
বছরের পর বছর যায়, সকলে বড় হয়ে উঠলাম। জিমনাস্টিকের আখড়ায় লালুর সমকক্ষ কেউ ছিল না। তার গায়ে জোর ছিল যেমন অসাধারণ, সাহস ছিল তেমনি অপরিসীম। ভয় কারে কয় সে বোধ করি জানত না। সকলের ডাকেই সে প্রস্ত্তত, সবার বিপদেই সে সকলের আগে এসে উপস্থিত। কেবল তার একটা মারাত্মক দোষ ছিল, কাউকে ভয় দেখাবার সুযোগ পেলে সে কিছুতে নিজেকে সামলাতে পারত না। এতে ছেলে বুড়ো গুরুজন সবাই তার কাছে সমান। আমরা কেউ ভেবে পেতাম না, ভয় দেখাবার এমন সব অদ্ভুত ফন্দি তার মাথায় এক নিমিষেই কোথা থেকে আসে! দু-একটা ঘটনা বলি।
পাড়ার মনোহর চাটুজ্জের বাড়ি কালীপূজো। দুপুর-রাতে বলির ক্ষণ বয়ে যায়, কিন্তু কামার অনুপস্থিত। লোক ছুটল ধরে আনতে, কিন্তু গিয়ে দেখে সে পেটের ব্যথায় অচেতন। ফিরে এসে সংবাদ দিতে সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসল, উপায়! এত রাতে ঘাতক মিলবে কোথায়? দেবীর পূজো পন্ড হয়ে যায় যে! কে একজন বললে, পাঁঠা কাটতে পারে লালু। এমন অনেক সে কেটেছে। লোক দৌড়ল তার কাছে। লালু ঘুম ভেঙে উঠে বসল, বলল- না।

না কী গো? দেবীর পূজোয় ব্যাঘাত ঘটলে সর্বনাশ হবে যে!

লালু বললে, হয় হোক গে। ছোটবেলায় ও-কাজ করেছি, কিন্তু এখন আর করব না।

যারা ডাকতে এসেছিল তারা মাথা কুটতে লাগল, আর দশ-পনেরো মিনিট মাত্র সময়, তার পরে সব নষ্ট, সব শেষ। তখন মহাকালীর কোপে কেউ বাঁচবে না। লালুর বাবা এসে আদেশ দিলেন যেতে। বললেন, ওঁরা নিরূপায় হয়েই এসেছেন,-না গেলে অন্যায় হবে। তুমি যাও।

সে আদেশ অমান্য করার সাধ্য লালুর নেই।

লালুকে দেখে চাটুজ্জে মশায়ের ভাবনা ঘুচল। সময় নেই, তাড়াতাড়ি পাঁঠা উৎসর্গিত হয়ে কপালে সিঁদুর, গলায় জবার মালা পরে হাড়িকাঠে পড়ল, বাড়িসুদ্ধ সকলের মা’ ‘মারবের প্রচন্ড চিৎকারে নিরূপায় নিরীহ জীবের শেষ আর্তকণ্ঠ কোথায় ডুবে গেল, লালুর হাতে খাঁড়া নিমিষে ঊর্ধ্বোত্থিত হয়েই সজোরে নামল, তার পরে বলির ছিন্নকণ্ঠ থেকে রক্তের ফোয়ারা কালো মাটি রাঙা করে দিলে। লালু ক্ষণকাল চোখ বুজে রইল। ক্রমশ ঢাক ঢোল কাঁসির সংমিশ্রণে বলির বিরাট বাজনা থেমে এল। যে পাঁঠাটা অদূরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল আবার তার কপালে চড়ল সিঁদুর, গলায় দুললো রাঙা মালা, আবার সেই হাড়িকাঠ, সেই ভয়ঙ্কর অন্তিম আবেদন,সেই বহুকণ্ঠের সম্মিলিত মা’ ‘মাধ্বনি।
(১০)
আবার লালুর রক্তমাখা খাঁড়া উপরে উঠে চক্ষের পলকে নিচে নেমে এল- পশুর দ্বিখন্ডিত দেহটা  ভূমিতলে বার-কয়েক হাত-পা আছড়ে কি জানি কাকে শেষ নালিশ জানিয়ে স্থির হলো; তার কাটা-গলার রক্তধারা রাঙামাটি আরও খানিকটা রাঙিয়ে দিলে।
ঢুলিরা উন্মাদের মতো ঢোল বাজাচেছ। উঠানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে বহু লোকের বহু প্রকারের কোলাহল; সম্মুখের বারান্দায় কার্পেটের আসনে বসে মনোহর চাটুজ্জে মুদ্রিত নেত্রে ইষ্টনাম জপে রত, অকস্মাৎ লালু ভয়ঙ্কর একটা হুঙ্কার দিয়ে উঠল। সাড়া-শব্দ গেল থেমে-সবাই বিস্ময়ে স্তব্ধ-এ আর কী! লালুর অসম্ভব বিস্ফোরিত চোখের তারা দুটো যেন ঘুরছে, চেঁচিয়ে বললে, আর পাঁঠা কই?
বাড়ির কে একজন ভয়ে ভয়ে জবাব দিলে, আর ত পাঁঠা নেই। আমাদের শুধু দুটো করেই বলি হয়।
লালু তার হাতের রক্তমাখা খাঁড়াটা মাথার উপরে বার-দুই ঘুরিয়ে ভীষণ কর্কশকণ্ঠে গর্জন করে উঠল- নেই পাঁঠা? সে হবে না। আমার খুন চেপে গেছে- দাও পাঁঠা, নইলে আজ আমি যাকে পাব ধরে নরবলি দেব- ‘মা’ ‘মা-জয়-কালী! বলেই একটা মস্ত লাফ দিয়ে সে হাড়িকাঠের এদিক থেকে ওদিক গিয়ে পড়ল। তার হাতের খাঁড়া তখন বনবন করে ঘুরচে। তখন যে কান্ড ঘটল ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। সবাই একসঙ্গে ছুটল সদর দরজার দিকে, পাছে লালু ধরে ফেলে। পালাবার চেষ্টায় বিষম ঠেলাঠেলি।
হুড়োমুড়িতে সেখানে যেন দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার বেধে গেল। কেউ পড়েছে গড়িয়ে, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে, কারও পায়ের ফাঁকের মধ্যে মাথা গলিয়ে বেরোবার চেষ্টা করছে, কারও গলা কারও বগলের চাপের মধ্যে পড়ে দম আটকাবার মতো হয়েছে, একজন আর একজনের ঘাড়ের উপর দিয়ে পালাবার চেষ্টায় ভিড়ের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছে- কিন্তু এসব মাত্র মুহূর্তের জন্য। তার পরেই সমস্ত ফাঁকা।

লালু গর্জে উঠল- মনোহর চাটুজ্জে কই? পুরুত গেল কোথায়?

পুরুত রোগা লোক, সে গন্ডগোলের সুযোগে আগেই গিয়ে লুকিয়েছে প্রতিমার আড়ালেগুরুদেব কুশাসনে বসে চন্ডীপাঠ করছিলেন, তাড়াতাড়ি উঠে ঠাকুর দালানের একটা মোটা থামের পিছনে গা-ঢাকা দিয়েছেন। কিন্তু, বিপুলায়তন দেহ নিয়ে মনোহরের পক্ষে ছুটাছুটি করা কঠিন। লালু এগিয়ে গিয়ে বাঁ হাতে তাঁর একটা হাত চেপে ধরলে, বললে, চলো হাড়িকাঠে গিয়ে গলা দেবে।

একে তার বজ্রমুষ্টি, তাতে ডান হাতে খাঁড়া, ভয়ে চাটুজ্জের প্রাণ উড়ে গেল। কাঁদো-কাঁদো গলায় মিনতি করতে লাগলেন, লালু! বাবা! স্থির হয়ে চেয়ে দেখ- আমি পাঁঠা নই, মানুষ। আমি সম্পর্কে তোমার জ্যাঠামশাই হই বাবা, তোমার বাবা আমার ছোটভাইয়ের মতো।

সে জানিনে। আমার খুন চেপেছে- চলো তোমাকে বলি দেব! মায়ের আদেশ!

চাটুজ্জে ডুকরে কেঁদে উঠলেন- না বাবা, মায়ের আদেশ নয়, কখ্‌খনো নয়-মা যে জগজ্জননী।

লালু বললে-জগজ্জননী ! সে জ্ঞান আছে তোমার? আর দেবে পাঁঠা-বলি? ডেকে পাঠাবে আমাকে পাঁঠা কাটতে? বলো।
(১১)
চাটুজ্জে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, কোনোদিন নয় বাবা, আর কোনোদিন নয়, মায়ের সমুখে তিন সত্যি করছি, আজ থেকে আমার বাড়িতে বলি বন্ধ।

ঠিক তো?

ঠিক বাবা ঠিক। আর কখনো না। আমার হাতটা ছেড়ে দাও বাবা, একবার পায়খানায় যাব।
লালু হাত ছেড়ে দিয়ে বললে- আচ্ছা যাও, তোমাকে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু পুরুত পালাল কোথা দিয়ে? গুরুদেব? সে কই? এই বলে সে পুনশ্চ একটা হুঙ্কার দিয়ে লাফ মেরে ঠাকুর দালানের দিকে অগ্রসর হতেই প্রতিমার পিছন ও থামের আড়াল হতে দুই বিভিন গলার ভয়ার্ত ক্রন্দন উঠল। সরু ও মোটায় মিলিয়ে সে শব্দ এমন অদ্ভুত ও হাস্যকর যে, লালু নিজেকে আর সামলাতে পারলে না। হাঃ হাঃ হাঃ করে হেসে উঠে দুম করে মাটিতে খাঁড়াটা ফেলে দিয়ে এক দৌড়ে বাড়ি ছেড়ে পালাল।

তখন কারও বুঝতে বাকি রইল না খুনচাপা-টাপা সব মিথ্যে, সব তার চালাকি। লালু শয়তানি করে এতক্ষণ সবাইকে ভয় দেখাচ্ছিল। মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে যে যেখানে পালিয়েছিল ফিরে এসে জুটল। ঠাকুরের পূজো তখনো বাকি, তাতে যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটেছে এবং মহা হৈচৈ কলরবের মধ্যে চাটুজ্জে মশাই সকলের সম্মুখে বারবার প্রতিজ্ঞা করতে লাগলেন- ঐ বজ্জাত ছোঁড়াটাকে যদি না কাল সকালেই ওর বাপকে দিয়ে পঞ্চাশ ঘা জুতো খাওয়াই ত আমার নামই মনোহর চাটুজ্জে নয়।

কিন্তু জুতো তাকে খেতে হয়নি। ভোরে উঠেই সে যে কোথায় পালাল, সাত-আটদিন কেউ তার খোঁজ পেল না। দিন-সাতেক পরে একদিন অন্ধকারে লুকিয়ে মনোহর চাটুজ্জের বাড়িতে ঢুকে তাঁর ক্ষমা এবং পায়ের ধুলো নিয়ে সে-যাত্রা বাপের ক্রোধ থেকে নিস্তার পেলে। কিন্তু সে যাই হোক, দেবতার সামনে সত্য করেছিলেন বলে চাটুজ্জে বাড়ির কালীপূজোয় তখন থেকে পাঁঠাবলি উঠে গেল।

গুরুচণ্ডালী - শিবরাম চক্রবর্তী

  গুরুচন্ডালী
শিবরাম চক্রবর্তী
সীতানাথবাবু ছিলেন সেকেন্ড পন্ডিত, বাংলা পড়াতেন। ভাষার দিকে তাঁর দৃষ্টি একটুও ভাসা-ভাসা ছিল না-ছিল বেশ প্রখর। ছেলেদের লেখার মধ্যে গুরুচন্ডালী তিনি মোটেই সইতে পারতেন না।

সপ্তাহের একটা ঘণ্টা ছিল ছেলেদের রচনার জন্যে বাঁধা। ছেলেরা বাড়ি থেকে রচনা লিখে আনত- একেক সময়ে ক্লাসে বসেও লিখত। সীতানাথবাবু সেইসব রচনা পড়তেন, পড়ে-পড়ে আগুন হতেন। ছাত্রদের সেই রচনা পরীক্ষা করা, সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতোই একটা উত্তপ্ত ব্যাপার ছিল সীতানাথবাবুর কাছে। যেমন তাঁর তেমনি আমাদেরও। এত করে বকেঝকেও গুরুচন্ডালী দোষ যে কাকে বলে ছাত্রদের তিনি তা বুঝিয়ে উঠতে পারেননি-উক্ত দোষমুক্ত করা তো দূরে থাক।

সেদিনও তিনি ক্লাসসুদ্ধ ছেলের রচনা খাতায় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখতে-দেখতে তাঁর চোখ লাল হয়ে উঠল, হাতের দু-রঙা পেনসিলের লাল দিকটা ঘসঘস করে চলতে লাগল খাতার ওপর- রচনার লাইনগুলো ফসফস করে লাল দাগে কেটে-কেটে তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। এর চেয়ে ছেলেদের চাবুকে লাল করা যেন সোজা অনেক-ছিল ঢের আরামের-আর তা করতে পারলে যেন গায়ের ঝাল মিটত তাঁর।
(১৫)
খাতাগুলো পাশে সরিয়ে রেখে তিনি বললেন-‘এ আর কী দেখব! খালি গুরুচন্ডালী। কতবার করে বলেছি, হয় সাধুভাষায় লেখো, নয়তো কথ্যভাষায়। যেটাতেই লেখো তা ঠিক হবে। কিন্তু একরকমের হওয়া চাই। সাধুভাষায় আর কথ্যভাষায় মিশিয়ে খিচুড়ি পাকানো চলবে না। না, কিছুতেই না। কিন্তু এখনো দেখছি সেই খিচুড়ি-সেই জগাখিচুড়ি।’

গণেশ বললে-‘আমি সাধুভাষায় লিখেছি স্যার।’

‘সাধুভাষায় লিখেছ? এই তোমার সাধু সাধুভাষা?’ সীতানাথবাবু গাদার ভেতর থেকে তার খাতাটা উৎখাত করেন-‘কী হয়েছে এ? ‘দুগ্ধফেননিভ শয্যায় সে ধপাস করিয়া বসিয়া পড়িল’?’

‘দুগ্ধফেননিভের সঙ্গে-‘কেন স্যার, ‘করিয়া’ তো দিয়েছি আমি। করিয়া কি সাধুভাষা হয়নি স্যার?’

‘কিন্তু ধপাস? ধপাস কী ভাষা? দুগ্ধফেননিভের পরেই এই ধপাস?’

গণেশ এবার ফেননিভের মতোই নিভে যায়, টুঁ শব্দটি করতে পারে না।

‘কতবার বলেছি তোমাদের যে, ভাষায় খিচুড়ি পাকিয়ো না। হয় সাধুভাষায় নয় কথ্যভাষায়- যেটায় হয় একটাতে লেখো। কিন্তু দেখো, আগাগোড়া যেন একরকমের হয়।-গণেশের এই বাক্যটিতে তোমাদের মধ্যে নিখুঁত করে বলতে পারো কেউ?’

‘পারি স্যার।’ মানস উঠে দাঁড়াল। কিন্তু দাঁড়িয়েই মাথা চুলকোতে লাগল সে। ধপাস-এর সাধুভাষা কী হবে তার জানা নেই। খানিক মাথা চুলকে আমতা-আমতা করে সে নিজেও ধপাস করে বসে পড়ল। তার মানসে যে কী ছিল তা জানা গেল না। সরিৎ উঠে বলল, ‘কিসে বলব স্যার? কথ্য ভাষায়, না অকথ্য ভাষায়?

‘যাতে তোমার প্রাণ চায়।’

‘দুগ্ধফেননিভ শয্যায় আয়েস করে বসল।’

‘দুগ্ধফেননিভের সঙ্গে আয়েস?’ সীতানাথ বাবুর মুখখানা-উচ্ছের পায়েস খেলে যেমন হয় তেমনিধারা হয়ে উঠে : ‘ওহে বাপু! গুরুচন্ডালী কাকে বলে তা কি তোমাদের মগজে ঢুকেছে? মনে করো যে, যে-চাঁড়ালটা আমাদের এই স্কুলে ঝাঁট দেয়, সে যদি হেডমাস্টার মশায়ের সঙ্গে একাসনে বসে, তাহলে সেটা দেখতে কেমন লাগে? সেটা যেমন দৃষ্টিকটু দেখাবে, কতকগুলি সাধু-শব্দের মধ্যে একটা অসাধু-শব্দ ঢুকলে ঠিক সেইরকম খারাপ দেখায়, তাই না? সাধুভাষার শব্দ যে কথ্যভাষার শব্দের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসতে পারে না, সেই কথাই আবার অন্যান্য সাধু-শব্দের সঙ্গে মিশ খেয়ে বেশ মানিয়ে যেতে পারে। যেমন উদাহরণস্বরূপ-’

‘বলব স্যার? এতক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি।’ বলে ওঠে গণেশ : ‘দুগ্ধফেননিভ শয্যায় আয়াস-সহকারে বসিল। কিম্বা উপবেশন করিল।- হয়েছে স্যার এবার?’

‘কিংবা আরও বেশি সাধুতা করে আমরা বলতে পারি-’ নিরঞ্জন উঠে দাঁড়ায় : ‘আসন গ্রহণ করিল। কিংবা আসন পরিগ্রহ করিল।’

দীপক বলে, ‘সমাসীন হইল’ও বলা যায়।

‘আবার তুই এর মধ্যে সমাস এনে ঢোকাচিছস?’ গণেশ তার কানের গোড়ায় ফিসফিস করে, ‘এতেই কেঁদে কূল পাইনে, এর ওপর ফের সমাস?’
(১৬)
‘যেমন উদাহরণস্বরূপ-’ সীতানাথবাবু বলতে থাকেন... কিন্তু তাঁর বলার মাঝখানেই পিরিয়ডের ঘণ্টা বেজে যায়। উদাহরণস্বরূপ প্রকাশের আগেই তাঁকে ক্লাস ছেড়ে যেতে হয়।

নিজের বক্তব্য আরেক দিনের জন্যে রেখে সমস্ত প্রশ্নটাই আমূল মূলতবি করে যান।
দিনকয়েক পরে গণেশ রেশন আনতে গিয়ে দেখল যে, সেকেন্ড পন্ডিত মশাইও সেই সরকারি দোকানে এসেছেন। লম্বা লাইনের ফাঁকে সীতানাথবাবুও দাঁড়িয়ে। সেই কিউয়ের ভেতর মহল্লার ঝাড়ূদার-নিশ্চয়ই সেখানে চন্ডাল-যেমন রয়েছে, তেমনি আছে পাড়ার গুন্ডারা। তারাও কিছু সাধু নয়। গুরুতর লোক। তাদের প্রচন্ডালই বলা যায় বরং। প্রচন্ড তাদের দাপট। পাড়ার সার এবং অসার-সবাই এক সারের মধ্যে খাড়া। একেবারে সমান সমান। রীতিমতোই গুরুচন্ডালী। সীতানাথবাবু ছিলেন সারির মাঝামাঝি। গণেশ অনেক পরে এসে শেষের দিকে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সীতানাথবাবুকে। চন্ডালদের মধ্যে গুরুদেব-ব্যাকরণ বিরুদ্ধ এই অভাবিত মিলনদৃশ্য দেখে সে অবাক হলো। সত্যি বলতে সে-দৃশ্য অবাক হয়ে দেখবার মতোই।

সীতানাথবাবুর দৃষ্টি কোনোদিকে ছিল না। অজগরের মতো বিরাট লাইন যেন কচছপের গতিতে একপা- এক-পা করে এগুচ্ছে। কতক্ষণে রেশন নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরবেন, হাঁড়ি চড়িয়ে চান সেরে নাকে-মুখে দুটি গুঁজে পাড়ি দেবেন স্কুলে, সেই ভাবনাতেই সমস্ত মন পড়েছিল তাঁর।

সহসা এক বালকসুলভ তীক্ষ্ণকণ্ঠ তাঁর কানে এসে পিন ফোটাল। ফুটতেই তিনি সচকিত হয়ে উঠলেন-‘স্যার, স্যার ! ব্যগ্র হোন কল্য।’ ‘ব্যগ্র হোন কল্য?’ শুনতে পেলেন তিনি। শুনেই তিনি পিছন ফিরে তাকালেন। দেখতে পেলেন গণেশকে। কিউয়ের শেষে দাঁড়িয়ে চিৎকার ছাড়ছে : ‘ব্যগ্র হোন কল্য।’

তার মানে? কেন তিনি ব্যগ্র হবেন? আর হন যদিবা তো তা কালকে কেন? ব্যগ্র যদি হতেই হয় তো আজকেই কেন নয়? এই মুহূর্তেই বা নয় কেন? আর, এই মুহূর্তে ব্যগ্র হয়েই বা কী হবে? কিউয়ের লাইন তো আর ছেলেদের খাতার লাইন নয় যে পেনসিলের এক খোঁচায় ফ্যাঁশ করে কেটে এগিয়ে যাবেন! যত তাড়াই থাক, যতই ব্যগ্র হন, আগের লোকদের কাটিয়ে এগুবার একটুও উপায় নেই এখানে। ফাঁড়ার মতোই অকাট্য এই লাইন। ফাঁড়ির মতোই ভয়াবহ।

‘স্যার স্যার-পুনরায়! পুনরায়! ব্যগ্র হোন কল্য! ব্যগ্র হোন কল্য!’ আবার সেই আর্তনাদ। সীতানাথবাবুর ইচ্ছে করে এক্ষুনি গিয়ে বেশ একটু ব্যগ্রভাবেই গণেশের কানদুটো ধরে মলে দেন আচ্ছা করে। বেশ করে মলে দিয়ে বলেন, ‘এই মললাম অদ্য। ফের মলব কল্য।’ কিংবা তুলে ধরে এক আছাড় মারেন ওকে। কিন্তু ওকে পাকড়াবার এই ব্যগ্রতা দেখাতে গিয়ে লাইনের জায়গা পা-ছাড়া করার কোনো মানে হয় না।

আস্তে-আস্তে এগিয়ে দোকানের ভেতর পৌঁছে রেশনের দাম দিতে গিয়ে তাঁর চোখ কপালের কানায় ঠেকল - যেমন একটু আগে তাঁর কান চোখা হয়ে উঠেছিল। দ্যাখেন যে তাঁর পকেট মারা গেছে। পকেটের যেখানে টাকার ব্যাগটা থাকে, সেখানটা ফাঁকা। বৃথা হইচই না করে বিমুখে তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে আসেন।
(১৭)
‘স্যার, তখন আমি কী বলছিলাম? আমি অত করে বললাম, তা আপনি কানই দিলেন না। আদৌ কর্ণপাতই করলেন না !’ গণেশ অনেকটা এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে। দোকানের মুখে পৌঁছে মাস্টারের সম্মুখে পড়েছে। ‘কী বলেছিলে তুমি? তুমি তো আমায় কাল ব্যগ্র হতে বলেছিলে? আর এদিকে আমার আজ সর্বনাশ হয়ে গেল!’

‘কাল ব্যগ্র হতে বলেছি? মোটেই না। আমি বলেছিলাম আপনার ‘ব্যগ্র গ্রহণ করল’। আপনার পরেই যে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল, সে হতভাগাই পেছন থেকে আপনার পকেটে হাত ঢুকিয়ে-’

‘তা, ‘পকেট মারল’ বলতে তোর কী হয়েছিল রে হতমুখ্য?’ সীতানাথবাবুর সমস্ত রাগ এখন গণেশের ওপর গিয়ে পড়ে : ‘সোজাসুজি তা বললে কী হতো? তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো তোর? ‘পকেট মারছে সার’- বলতে কী আটকাচিছল তোমার পাপমুখে?’

‘ছি-ছি গণেশ!’ নিজের জিভ কাটে-‘অমন কথা বলবেন না স্যার! ‘পকেট মারছে’-সে কথা কি আপনার সামনে উচ্চারণ করতে পারি? পকেট প্রহার করছে বললেও তো শুদ্ধ হয় না। আর বলুন, গুরুমশায়ের সামনে অমন চন্ডালের মতন ভাষা কী বলতে আছে-বলা যায় কী? ও কথা-অমন কথা বলবেন না স্যার। ব্যগ্র গ্রহণ করল বলেছি-জানি যে, তাও সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হয়নি, গুরুচন্ডালী একটুখানি যেন রয়ে গেছে; ভাবলাম, কতবার ভাবলাম, কিন্তু কী করব, ব্যাগের সাধুভাষা যে কী তা তো আমার জানা নেই স্যার। কিন্তু কিছুতেই ব্যাগের শুদ্ধটা মগজে এল না। এদিকে ভাবতে-ভাবতে ব্যাগসুদ্ধ নিয়ে সে যে সটকাল!’


মা
আবু বক্কর সিদ্দিক

মা আমার মা 
তুমি যেন রাতের জ্যোৎস্না
মা আমার মা
তুমি আমার অগ্রগতির প্রেরণা।
তোমায় দেখে আমার 
দিনের শুরু
আর তোমায় দেখে শেষ,
তুমি আমার নয়নমণি 
তুমি আমার সর্বশেষ।
মা আমাদের কখনো বলেনা
মন্দ, অসৎ হওয়ার কথা,
মা আমাদের সর্বদা বলে, " বড়
হওয়ার কথা।"



Mother
Abu bakkar Siddik

Mom my mom
You light of the night
Mom my mom
You are progress motivated my 
I see you
when Start day
I saw you ,
when end day.
You are my last,
I that always say.

Our mother never say
Evil, to be dishonest,
Our mother always says, "big
Supposed to be. "

Saturday, 1 October 2016

ছাড়তে পারব না

ছাড়তে পারব না
মোঃ সৈকত আলী


তুমি যে আমার স্বপ্ন ,
তুমি যে আমার অর্ধেক প্রাণ
তোমাকে হারাতে চাই না আমি
খুজিব সেই মহা আমাজন। 
তোমায় দেখিলে ভুলি যে আমি
দুঃখ আর বেদনা ,
তুমি যে সেই একজন
যার জন্য আমার মন-মনা ,
তোমাকে ছাড়া থাকিব কেমনে আমি
তুমি আমার মনন-প্রেরণা।
তোমার চোখ যেন সমুদ্রের নীল জল
আছে তাতে সুন্দর ফুলে
সব সুগন্ধভরা মৌমাছির দল।
তোমাকে ভুলিব কেমন করে
থাকব তোমার পাশে,
আসবে হাত বাধা বিপত্তি
আটকাবো রাশে রাশে।